প্রশ্ন হলো সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়ে শেষ পর্যন্ত কোথায় দাঁড়াবে? এবং কোন পর্যায়ে এসে এই হার কমতে শুরু করবে?

এসম্পর্কিত একটি মডেল রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট - আইইডিসিআর-এর হাতে রয়েছে।

কিন্তু জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে পারে সেই বিবেচনায় এই মডেলটি সরকার বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে আনতে চাইছে না।

"এক দিক থেকে ঠিক কাজটিই করা হয়েছে। কারণ এই মুহূর্তে প্রজেকশন (পূর্বাভাস) করার মতো যথেষ্ট ডেটা (উপাত্ত) পাওয়া যাচ্ছে না," বলছেন ভাইরোলজিস্ট ড. নজরুল ইসলাম।
তিনি বলছেন, করোনাভাইরাস রোগীদের কাছ থেকে নমুনা-রস সংগ্রহের কাজে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে।

"একদিন নমুনা সংগ্রহ করে আরেকদিন তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। সেই তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে অন্য এক দিন। ফলে এর থেকে এখনই কোন সুনির্দিষ্ট মডেল তৈরি করা কঠিন।"

এর পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে আসা অনেক উপাত্ত 'সিস্টেম লস'-এর শিকার হচ্ছে বলে ড. ইসলাম সন্দেহ করেন।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং সম্ভাব্য মৃত্যুর হার নিয়ে গত ২৬শে মার্চে তৈরি জাতিসংঘের একটি ইন্টার-ডিপার্টমেন্টাল রিপোর্ট বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়।

এতে পূর্বাভাস করা হয়, বাংলাদেশে জনঘনত্বের বিবেচনায় করোনাভাইরাসে পাঁচ লাখ থেকে ২০ লাখ মানুষের জীবনহানি ঘটতে পারে।ড. হোসেন বলছেন, এটা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশে মৃত্যুহার হচ্ছে প্রতি ১০০০ জনে পাঁচ জন। অর্থাৎ প্রতিবছর নানা কারণে নয় লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষেত্রে একটি চিত্র পাওয়া যাবে সংক্রমণের হার-এর দিকে নজর রাখলে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার যদি 'এক্সপোনেনশিয়াল' হয় তাহলে সেটা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলবে বলে তারা স্বীকার করছেন।

এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথের একটি চিত্র পাওয়া যায় সেন্টার ফর ইনকুয়ারি-তে প্রকাশিত ভিনোদ ভরদ্বাজের একটি নিবন্ধ থেকে।

এখানে তিনি লিখছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ২৬শে মার্চ স্থানীয়ভাবে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ছিল ১৫। কিন্তু সারা দেশে লকডাউন থাকার পরও পরবর্তী ছয় সপ্তাহের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৬০,০০০।পূর্বাভাসের সমস্যা

কিন্তু এই পূর্বাভাসে একটি শর্ত ছিল। আর সেটি হলো করোনাভাইরাসের বিস্তার, প্রশমন এবং অবদমনে সরকারের তরফে একেবারেই যদি কোন ধরনের জরুরি পদক্ষেপ নেয়া না হয় তাহলেই শুধুমাত্র এই পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

বিবিসি বাংলার সাথে আলাপকালে রোগতত্ত্ববিদ ড. এ. এম. জাকির হোসেন বলছিলেন, এই ধরনের পূর্বাভাসের কিছু সমস্যা রয়েছে।

তিনি জানান, সংক্রমণ বিস্তারের কিছু শর্ত রয়েছে। এগুলো হলো: রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি, সংক্রমণের হার, আরোগ্যের হার, মৃত্যুর হার এবং রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনায় রয়েছেন এমন জনসংখ্যা।

"চীনের এক হিসেব মতে, করোনাভাইরাসে যারা মারা যাবেন তাদের মধ্যে ৭১% থেকে ৭৯% মারা যাবেন অন্য কোন রোগে, যাকে 'কো-মরবিডিটি' বলা হয়। যেমন, হার্টের সমস্যা," ব্যাখ্যা করছেন তিনি।

"বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চীনা হিসেবটিকে ব্যবহার করে আমরা ধরে নিতে পারি করোনাভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার পর যাদের বয়স ৬০ বছর বা তার ঊর্ধ্বে, এমন ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার মানুষতিনি বলছেন, সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে আরও অনেক বেশি কমিউনিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

গ্রামীণ এলাকায় সরকারের স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা এখনও বেশ কার্যকর, বলছেন তিনি, কিন্তু শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা মূলত বেসরকারি খাতে। ফলে সেখানে জরুরি ভিত্তিকে তৎপরতা বাড়াতে হবে।

"করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি সম্পর্কে গাণিতিক পূর্বাভাসের সুযোগ এখনও বেশ সীমিত। কারণ এবিষয়ে আমাদের নেই কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা। আর একেক দেশে এই ভাইরাস একেকভাবে ছড়াচ্ছে। ফলে এক দেশের মডেল অন্য দেশে প্রয়োগ করা কঠিন," বলেন ড. হোসেন।

ভাইরোলজিস্ট ড. নজরুল ইসলাম মনে করেন, সংক্রমণের বিস্তার সম্পর্কে জানতে হলে করোনাভাইরাস পরীক্ষার পরিধিকে আরো বাড়াতে হবে।

"করোনাভাইরাস শিগগীরই কমে যাবে একথা মনে করার কোন কারণ নেই। এটা অবশ্যই বাড়বে," বলছেন তিনি, "কিন্তু প্রশ্ন হলো আমরা এটাকে ঠিক কতখানি বাড়তে দেব।"

 কোমরবিডিটিতে মৃত্যুবরণ করতে পারেন।"করোনা পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসলেও ঘাবড়ে যাইনি। এমনিতেই আমার মনোবল শক্ত। চিকিৎসকেরা তাৎক্ষণিক সাহস দেন। হাসপাতালে থাকতে বলেন। আমিও মানসিকভাবে প্রস্তুত নিই। এখন আল্লাহের রহমত ও চিকিৎসকদের সেবায় সুস্থ আছি।'

এসব কথা করোনা জয় করা ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তির। চট্টগ্রাম নগরের ফিরিঙ্গিবাজারের এই কাঠ ব্যবসায়ীর করোনা ধরা পড়ে ১০ এপ্রিল। অবশ্য চিকিৎসকের পরামর্শে আগের দিন চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। ১১ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর তাঁর করোনা নেগেটিভ আসে। ২০ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন তিনি।
গত দুই বছরের মধ্যে দেশের বাইরে যাননি এই ব্যবসায়ী। ভাই ও ছেলে দেশের বাইরে থাকলেও ইতিমধ্যে দেশে আসেননি। তাই কীভাবে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হলেন তা বোধগম্য হচ্ছে না তাঁর।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে থেকে জ্বর আসে বলে জানান ফিরিঙ্গিবাজারের এই বাসিন্দা। প্রতিদিন জ্বর ৯৯ থেকে ১০২ এ ওঠা-নামা করে। ৯৯ এ আসলে তাঁর মনে হতো ভালো হয়ে গেছেন। কিন্তু আবার জ্বর বেড়ে যায়। এই অবস্থায় একটি বেসরকারি রোগনির্ণয়কেন্দ্রের কর্মীদের রক্ত ও প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করতে দেন। বাসা থেকে তা নিয়ে যান তাঁরা। এতে কিছু পাওয়া যায়নি।

কিন্তু জ্বর না কমায় এক চিকিৎসকের কাছে যান। প্রথমে অবশ্য দেখতে চাননি। পরে একজনের রেফারেন্স দিলে দেখতে রাজি হন। কিছু ওষুধ লিখে তখনই সরাসরি ফৌজদারহাটের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন ওই চিকিৎসক।

বর্তমানে বাসায় আইসোলেশনে থাকা ওই ব্যবসায়ী মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসকের মনে হয়েছিল তাঁর (ব্যবসায়ী) করোনার উপসর্গ রয়েছে। কিন্তু করোনার যে সব উপসর্গ বলা হচ্ছে কাশি, হাঁচি, শরীর ব্যথা এগুলো কিছুই ছিল না। তারপরও চিকিৎসকের কথা শুনে দেশে থাকা আরেক ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করেন। এরপরই ফৌজদারহাট হাসপাতালে চলে যান।

হাসপাতালের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ওখানে যাওয়ার পর তাঁকে ইনজেকশন দেওয়া হয়। আর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর নমুনার ফলের জন্য হাসপাতারে অপেক্ষা করতে থাকেন। আর ইনজেকশন দেওয়ার পর ওইদিন আর জ্বর আসেনি। পরদিন সন্ধ্যায় চিকিৎসক করোনার ফল পজিটিভ আসার বিষয়টি জানান।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনে কেমন মনে হয়েছে জানতে চাইলে বলেন, 'প্রথমে বোগাস মনে হয়েছে। কোনো ধরনের ভীতি কাজ করেনি। চিকিৎসকেরা জানান হাসপাতালে থাকতে হবে। এখানেই আপনার চিকিৎসা চলবে। আমি তাঁদের বললাম, 'থাকতে হলে তো থাকব।'

হাসপাতালের পরিবেশ ও চিকিৎসা সম্পর্কে খুবই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এই ব্যক্তি। তিনি বলেন, করোনার কথা শুনে যেখানে সবাই পালিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে এই লোকগুলো (চিকিৎসক-নার্স) রয়ে গেছেন। তাঁদের সম্মান করা উচিত। গোল্ড মেডেল দেওয়া দরকার। চিকিৎসকের ২০ ফুট দূরে থেকে কথা বললেও নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন। সাহস দিয়েছেন। তাঁরা যা করেছেন তা অভাবনীয়। আর হাসপাতালে পাঁচজনের থাকার মতো কক্ষে দুজন করে রেখেছে। আর নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। পরে প্রত্যেকবারই ফল নেগেটিভ আসে৷ এরপর ২০ এপ্রিল বাসায় যাওয়ার অনুমতি দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চীনে করোনা সংক্রমণ হওয়ার পর থেকে এই বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা প্রবন্ধ ও প্রতিবেদন নিয়মিত পড়তেন বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, মানুষ মনে করেছে করোনা মানে মৃত্যু। করোনা মানে ভয়। আসলে তা নয়। করোনা থেকে বাঁচতে হলে ঘরে থাকতে হবে, সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। করোনার উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রথমে ঘরেই থাকা যেতে পারে। তবে অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে চলে যেতে হবে। আর মনোবল শক্ত রাখতে হবে। এ ছাড়া তিনি বেশি বেশি করে পরীক্ষার জোর দেন।

Post a Comment

Previous Post Next Post